৮৩৭ পর্যটক নিয়ে সেন্টমার্টিনের পথে মৌসুমের প্রথম জাহাজ, ফিরল পর্যটকদের উচ্ছ্বাস

কক্সবাজার ও টেকনাফ প্রতিনিধি
০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০১ অপরাহ্ন

জাতীয়

৮৩৭ পর্যটক নিয়ে সেন্টমার্টিনের পথে মৌসুমের প্রথম জাহাজ, ফিরল পর্যটকদের উচ্ছ্বাস

দীর্ঘ অপেক্ষা ও নানা অনিশ্চয়তা পেরিয়ে অবশেষে শুরু হয়েছে কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন নৌপথে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকালে ৮৩৭ জন পর্যটক নিয়ে মৌসুমের প্রথম জাহাজ এমভি বার আউলিয়া সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে যাত্রা করেছে। এতে দ্বীপকেন্দ্রিক পর্যটন কার্যক্রমে নতুন করে গতি ফেরার আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টায় কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়ার বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে জাহাজটি ছেড়ে যায়। এর আগে ভোর থেকেই পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে ঘাট এলাকা। দীর্ঘ বিরতির পর সেন্টমার্টিন ভ্রমণের সুযোগ পেয়ে অনেক পর্যটকের মধ্যে দেখা যায় বাড়তি উচ্ছ্বাস।

তবে মৌসুমের প্রথম যাত্রাতেই টিকিটের মূল্যবৃদ্ধি ও বুকিং-সংক্রান্ত ভোগান্তি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন কয়েকজন যাত্রী। পাশাপাশি দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় এবার জাহাজঘাটে প্লাস্টিক, পলিথিন ও সাউন্ডবক্স বহনের ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি রাখা হয়েছে।

পরিবেশ সংরক্ষণবিষয়ক সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে ঘাটে দায়িত্ব পালন করেন জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিআইডব্লিউটিএ ও কোস্ট গার্ডের সদস্যরা। এ সময় পর্যটকদের সঙ্গে থাকা একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ও সাউন্ডবক্স জাহাজে নিতে বাধা দেওয়া হয়। পরিবেশ রক্ষায় পর্যটকদের সচেতন করতে কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকেও মাইকিং করা হয়।

সেন্টমার্টিনগামী জাহাজ মালিকদের সংগঠন সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (স্কোয়াব) সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর জানান, প্রথম দিন ৮৩৭ জন যাত্রী নিয়ে এমভি বার আউলিয়া যাত্রা শুরু করেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, সেন্টমার্টিনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পর্যটকদের নির্ধারিত বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে। দ্বীপের কেয়াবনে প্রবেশ, ছেঁড়াদ্বীপে যাওয়া, পার্টি আয়োজন ও উচ্চ শব্দ সৃষ্টি নিষিদ্ধ রয়েছে। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয়, এমন কোনো কর্মকাণ্ডও করা যাবে না।

তিনি আরও জানান, পর্যটকদের সঙ্গে থাকা প্লাস্টিকের বোতল ও অন্যান্য বর্জ্য ঘাটে নির্ধারিত স্থানে জমা রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কয়েকটি সাউন্ডবক্সও পর্যটকদের কাছ থেকে নিয়ে জাহাজ কর্তৃপক্ষের কাছে সংরক্ষণের জন্য রাখা হয়েছে। পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসরণের জন্য তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান।

পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুর রহমান সায়েম জানান, প্রথম দিনে প্রায় ৮৩৭টি টিকিট বিক্রি হয়েছে। এটি জাহাজটির মোট যাত্রী ধারণক্ষমতার প্রায় এক-চতুর্থাংশ। পর্যটকদের পরিবেশ সংরক্ষণবিষয়ক নিয়মকানুন সম্পর্কে অবহিত করার পাশাপাশি প্লাস্টিক ও সাউন্ডবক্স বহন না করার বিষয়েও সচেতন করা হয়েছে।

প্রথমবার সেন্টমার্টিন ভ্রমণের সুযোগ পেয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন পর্যটক পপি সাবরিন জেসি। তিনি জানান, এর আগে কখনো দ্বীপটিতে যাওয়া হয়নি। এবার মৌসুমের প্রথম দিনেই যাওয়ার সুযোগ পাওয়ায় তাঁর আনন্দ আরও বেড়েছে। একটি দলের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে তিনি গাইড হিসেবেও দ্বীপে যাচ্ছেন।

অন্যদিকে টিকিটের দাম ও যাত্রার ভোগান্তি নিয়ে অভিযোগ করেছেন ঢাকা থেকে আসা পর্যটক হৃদয়। তাঁর ভাষ্য, অনলাইনে টিকিট কেনার পরও ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। এবার সর্বনিম্ন টিকিটের দাম ৪ হাজার ২০০ টাকা, যা আগে ছিল ৩ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি টিকিটে ৭০০ টাকা বেড়েছে। এ মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

তবে পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারের নেওয়া উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক ড. এস এম মোজাম্মেল হোসেন। তাঁর মতে, সেন্টমার্টিন পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দ্বীপ। এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ণ রাখতে পর্যটকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

স্কোয়াব সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সেন্টমার্টিন রুটে চলাচলের অনুমতি পেয়েছে তিনটি জাহাজ। এগুলো হলো এমভি বার আউলিয়া, এমভি কর্ণফুলি ও এমভি টেকনাফ। জাহাজ তিনটির সম্মিলিত যাত্রী ধারণক্ষমতা ২ হাজার ২৯৮ জন। এর মধ্যে এমভি বার আউলিয়ায় ৮৫০, এমভি কর্ণফুলিতে ৭৩২ এবং এমভি টেকনাফে ৭১৬ জন যাত্রী বহন করা যাবে।

নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে এমভি বার আউলিয়া সকাল ৭টা, এমভি কর্ণফুলি সকাল ৭টা ১৫ মিনিট এবং এমভি টেকনাফ সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে ছেড়ে যাওয়ার কথা। ফিরতি যাত্রায় সেন্টমার্টিন ঘাট থেকে জাহাজ তিনটি যথাক্রমে দুপুর ২টা ৩০ মিনিট, দুপুর ২টা ১৫ মিনিট এবং বিকেল সাড়ে ৩টায় ছাড়বে।

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত ১ নভেম্বর থেকে আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকদের জন্য সেন্টমার্টিন দ্বীপ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। এ সময়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ হাজার পর্যটক দ্বীপে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি দ্বীপে রাতযাপনের জন্য ৩ হাজার ৫০০ পর্যটকের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রত্যেক পর্যটককে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে। ভ্রমণের ক্ষেত্রে ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোডযুক্ত টিকিট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় একাধিক বিধিনিষেধও কার্যকর রয়েছে। রাতে সৈকত ও আশপাশের এলাকায় আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ সৃষ্টি এবং বারবিকিউ পার্টি আয়োজন নিষিদ্ধ। এ ছাড়া কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ ও কেনাবেচা এবং সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, শামুক, ঝিনুক, তারামাছ, রাজকাঁকড়া, সামুদ্রিক ঘাস ও শৈবালের ক্ষতি হয়—এমন কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় সেন্টমার্টিনকে ঘিরে পর্যটন ব্যবসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে পর্যটন কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে।