উনিশ শতকের স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন: মানিকগঞ্জের ঐতিহাসিক বালিয়াটি জমিদার বাড়ি
মানিকগঞ্জের বালিয়াটি জমিদার বাড়ি
বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের এক গৌরবময় সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মানিকগঞ্জের বালিয়াটি জমিদার বাড়ি। উনিশ শতকে নির্মিত এই প্রাসাদটি দেশের অন্যতম বৃহৎ ও সুদৃশ্য জমিদার বাড়ির একটি। কালের বিবর্তনে জমিদার প্রথা বিলুপ্ত হলেও, এর দেয়ালগুলোতে আজো জড়িয়ে আছে ইতিহাসের গল্প ও প্রাচীন স্থাপত্যের চোখধাঁধানো কারুকার্য।
ইতিহাসের পাতা থেকে
এই প্রভাবশালী জমিদার বংশের গোড়াপত্তন হয়েছিল সাধারণ এক ব্যবসায়ী পরিবারের হাত ধরে। জানা যায়, বালিয়াটির জমিদার পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন গোবিন্দ রাম সাহা। তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী মহাজন ও বড় ব্যবসায়ী। শুরুতে তিনি মূলত লবণের ব্যবসা করতেন। তামাক ও লবণের ব্যবসায় বিপুল ধনাঢ্য হওয়ার পর তার সন্তানরা ও বংশধররা এই এলাকায় জমিদারি এস্টেট গড়ে তোলেন এবং একের পর এক সুদৃশ্য প্রাসাদ নির্মাণ শুরু করেন।
স্থাপত্যশৈলী ও প্রাসাদের গঠন
বালিয়াটি জমিদার বাড়ির মূল আকর্ষণ হলো এর ইউরোপীয় ও গোথিক স্থাপত্য ঘরানার মিশ্রণ। বিশাল এই রাজপ্রাসাদটি প্রায় ৫.৮৮ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত।
- পাঁচটি পৃথক ভাগ ও আটটি ভবন: পুরো প্রাসাদ চত্বরটি প্রধানত পাঁচটি পৃথক ব্লকে বিভক্ত। এখানে ছোট-বড় মিলিয়ে সর্বমোট আটটি সুবিশাল দ্বিতল ও ত্রিতল স্থাপনা বা ভবন রয়েছে।
- কোরিনথিয় স্তম্ভ ও সিংহদ্বার: প্রাসাদটির সম্মুখভাগ অর্থাৎ দক্ষিণ দিকের ইমারতগুলো আপনাকে মুগ্ধ করবে। প্রতিটি ভবনের সামনে রয়েছে সুউচ্চ ও দৃষ্টিনন্দন কোরিনথিয় স্তম্ভের (Corinthian Pillars) সারি। দূর থেকে দেখলে মনে হবে রোমান স্থাপত্যের কোনো দুর্গ। প্রাসাদ চত্বরে প্রবেশের জন্য দক্ষিণ দিকে রয়েছে চারটি বিশাল সিংহদ্বার, যা তৎকালীন জমিদারদের শৌর্য-বীর্য প্রকাশ করে।
- বিশাল দিঘি ও অন্দরমহল: প্রাসাদের ঠিক পেছন দিকে (উত্তর অংশে) রয়েছে একটি বিশাল আকৃতির পুকুর বা দিঘি। দিঘির চারপাশেই সান বাঁধানো ঘাট রয়েছে, যা রানীদের স্নান ও ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। পুরো প্রাসাদ এলাকাটি উঁচু প্রাচীর দিয়ে সুরক্ষিত।
রং মহল ও বর্তমান জাদুঘর
জমিদার বাড়ির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ভবনটি ‘রং মহল’ নামে পরিচিত। এই রং মহলেই মূলত জমিদাররা তাদের প্রমোদ, বিনোদন ও সভা-পার্বণের আয়োজন করতেন। বর্তমানে এই ঐতিহ্যবাহী রং মহলেই স্থাপন করা হয়েছে একটি সুসজ্জিত জাদুঘর। বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ১৯৮৭ সালে একে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে এর দায়িত্ব নেয়। জাদুঘরটিতে জমিদারদের ব্যবহৃত বিশাল লোহার সিন্দুক, ঝাড়বাতি, দামি ঝিনুকের কারুকার্য করা আসবাবপত্র, তৈলচিত্র এবং ঐতিহাসিক নানা নিদর্শন দর্শনার্থীদের জন্য সংরক্ষণ করা আছে।
পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য
ঢাকা থেকে মাত্র ৩৫ কিলোমিটার দূরে মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়া উপজেলায় অবস্থিত হওয়ায় এটি বর্তমানে একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। প্রতিদিন দেশ-বিদেশ থেকে বহু ইতিহাসপ্রেমী ও ভ্রমণপিয়াসু মানুষ এখানে আসেন প্রাচীন বাংলার ধনিক শ্রেণীর জীবনযাত্রা ও স্থাপত্যের রূপ দেখতে।
নিউজ পোর্টালের খবরটিকে আরো তথ্যবহুল করতে আপনি চাইলে নিচের অতিরিক্ত তথ্যগুলো যুক্ত করতে পারেন:
- টিকিট ও সময়সূচি: বর্তমানে (গ্রীষ্ম ও শীতকালীন সময় অনুযায়ী) এটি রবিবার পূর্ণ দিবস এবং সোমবার অর্ধদিবস বন্ধ থাকে। বাকি দিনগুলোতে সরকারি নির্ধারিত টিকিটের বিনিময়ে সাধারণ মানুষ ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন।
- যাতায়াত ব্যবস্থা: ঢাকা থেকে মানিকগঞ্জ বা সাটুরিয়াগামী বাসে করে সাটুরিয়া বাসস্ট্যান্ডে নেমে খুব সহজেই রিকশা বা সিএনজিচালিত অটোতে করে এই জমিদার বাড়িতে পৌঁছানো যায়।